এর বিকল্প হিসেবে ওমানের উপকূলঘেঁষে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ গোপন একটি বিকল্প পথ ব্যবহার করা হচ্ছে। নৌ-পরিবহন খাতের নির্বাহীরা সতর্ক করে বলেছেন, সম্পূর্ণ অন্ধকারে জিপিএস ট্র্যাকিং সংকেত বন্ধ করে এ পথে জাহাজগুলো চলাচল করায় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ সংকটপূর্ণ জলপথ দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনে সহায়তার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি ‘গোপন অভিযান’ পরিচালনা করছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এ সামরিক অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত মাসে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সুরক্ষায় ওমানের নৌপথটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫টি জাহাজ যাতায়াত করছে, যার বেশির ভাগই জ্বালানি তেলের ট্যাংকার। ট্রাম্পের দাবি, এ অভিযানের ফলে প্রায় ২০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে প্রণালিটি পার হতে পেরেছে এবং এতে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল পরিবহনকারী কোম্পানিগুলো এ রুটের নৌনিরাপত্তা ও অন্য বড় ঝুঁকি নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। নৌবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমানের পাথুরে উপকূল ঘেঁষে তৈরি এ বিকল্প পথটি কোনো কোনো পয়েন্টে মাত্র ৮০০ মিটার প্রশস্ত। বিশাল আকৃতির তেলবাহী ট্যাংকার নিয়ে এ সরু ও দ্বিমুখী রুটে যাতায়াত বেশ কঠিন। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং এ রুটের নৌযান চালনার জটিলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এখানে বড় জাহাজের দিক পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
ইরানের নজরদারি ও হামলা এড়াতে জাহাজগুলো জিপিএস সিগন্যাল ও সব ধরনের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে রাতের অন্ধকারে চলাচল করছে, যা ‘ডার্ক ট্রানজিট’ নামে পরিচিত। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ গোপন যাতায়াতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ সচল রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। মূলত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা দৈনিক ছয়টি সুপারট্যাংকারের ধারণক্ষমতার সমান।
জ্বালানিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বর্তমানে এ বিকল্প পথ ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি করতে পারছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ওমান উপসাগরে মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। কম ঝুঁকিপূর্ণ ছোট জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন করে ওমানের সোহর ও ফুজাইরাহ বন্দরের কাছে অপেক্ষমাণ বড় ট্যাংকারগুলোয় পৌঁছে দিচ্ছে। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানবহির্ভূত মোট জ্বালানি তেল বাণিজ্যের ৮০ শতাংশই এ শাটল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে।
তবে নৌ-পরিবহন নির্বাহীরা জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩৫টি জাহাজ যাতায়াত করত। মূল রুটটিতে ইরান মাইন পুঁতে রেখেছে এ আশঙ্কায় জাহাজগুলো ওমান রুট অথবা ইরানের জলসীমার উত্তর করিডোর ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এ উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। কোম্পানিগুলো একদিকে জ্বালানি তেল সরবরাহের চাপ এবং অন্যদিকে চরম নৌনিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছে।